আগামী দিনের যুদ্ধাস্ত্র ই-বোমা


Asif
আগামী দিনের যুদ্ধাস্ত্র ই-বোমা

এ যুগের আর পৌরণিক যুগের যুদ্ধের মধ্যে বিরাট পার্থক্য থাকলেও এক জায়গায় বেশ সাদৃশ্য রয়েছে। দু’যুগেই যুদ্ধ মানে রক্তপাত-নিপীরন, অস্ত্রের ঝনঝনানী, ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু আগামী দিনগুলোতে এ দৃশ্য পুরোপুরী বদলে যেতে পারে। আগামী দিনের যুদ্ধে এক ফোটাও রক্তপাত হবে না, একটি বাড়িও ধ্বংস হবে না। তার বদলে মানব জীবনে নেমে আসবে এক ভয়াবহ নিস্তদ্ধতা, কর্মচঞ্চল জনপথ হয়ে যাবে স্তদ্ধ। আর এ অবস্থার সৃষ্টি করবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বোমা। সংক্ষেপে বলা যায় ই-বোমা। প্রচলিত বোমার থেকে একেবারে আলাদা এই বোমা, মুহূর্তের মধ্যে পতন ঘটাতে পারে আধুনিক একটি নগরীর। কিন্তু কি রয়েছে এই ই-বোমায়, আর কেনই বা এটি এত ধ্বংসাত্মাক? আসলে প্রযুক্তির প্রতি আমাদের নির্ভশীলতাই এ সর্বনাশ ঘটাবে। ই-বোমা তৈরি হচ্ছে আমাদের এ দূর্বলতার সুযোগেই। বোমাটি তৈরি করাও খুব বেশি জটিল কিছু নয়। এটি আসলে বেতার তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ফ্ল্যাশ। যা যে কোন ইলেকট্রনিক্স সার্কিটে আঘাত করে মুহূর্তের মধ্যে তাকে ছাই বানিয়ে ফেলতে পারে। ই-বোমা শুধু মাত্র ইলেকট্রনিক্স সার্কিটেই আঘাত করে বলে একে ই- বোমা বলা হয়।
কম্পিউটার প্রযুক্তি এখন পুরো বিশ্বকে এক সুত্র গেঁথে দিয়েছে। উন্নত বিশ্ব এখন আনেকটাই প্রযুক্তি নির্ভর। একটা সময় আসবে যখন বিশ্বের প্রতিটি দেশই কম্পিউটার প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পরবে। তখন এই ই-বোমা কম্পিউটার সিস্টেমে আঘাতহেনে বিরাট ক্ষতি সাধন করেত পারে। যার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হতে পারে, যাতায়াত ব্যবস্থা স্থবির হয়ে যেতে পারে, অর্থ বাজারে নামতেপরে ধস, এমন কি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে পুরো কস্পিউটার নেটওয়ার্ক।

ই-বোমা ইতোমধ্যেই সামরিক অস্ত্রাগারের অংশ হয়ে উঠেছে। পঞ্চাশ বছর আগেই ই-বোমা নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। মার্কিন সেনাবাহিনী তখন ভিন্ন ধরেনর এ অস্ত্র তৈরির জন্য গবেষনা শুরু করে। শুরুতে ই-বোমা তৈরির মত শক্তিশালী বেতার তরঙ্গ তৈরি করা কঠিন হলেও ব্যপক গবেষনা করে বেতার তরঙ্গ তৈরির কয়েক টি উপায় বের কারা সম্ভব হয়েছে। মূলত ই-বোমা তৈরির জন্য দরকার উচ্চ ফ্রিকোয়েনন্সির বেতার তরঙ্গ। আর এ তরঙ্গ তৈরির জন্য ব্যাবহার করা হয় মার্কস জেনারেটর নামের একটি সিস্টেমের। মার্কস জেনারেটর আসেলে অনেক গুলো বড় বড় ক্যাপাসিটরের ব্যাংক। ক্যাপাসিটরগুলো এক সাথে চার্জ করে আবার একে একে ডিসচার্জ করলে বেরিয়ে আসবে বিদ্যুতের ঢেউ। আনেক গুলো উচ্চ গতির সুইচ এর মাধ্যমে এ বিদ্যুত বেরিয়ে যাবার ব্যবস্থা করলে প্রায় তিন শ’ পিকোসেকেন্ডের স্পন্দন তৈরি হবে। এই স্পন্দন গুলো ত্র্যান্টেনারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক শক্তির বিরাট এক বিস্ফোরন ঘটবে। ফলে নির্দিষ্ট সীমার মধ্য বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স সার্কিট বিকল হয়ে পরবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী ইতোমধ্যে মার্কস জেনারেটরের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হরেছে। বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্ঠা করছেন মার্কস জেনারেটর বিমানের মধ্যে স্থাপনের জন্য। যদি বিমানের দিকে কোন মিসাইল ছুটে আসতে থাকে, ই-বোমার মাধ্যমে আগেই মিসাইলের ইলেকট্রনিক্স সার্কিট বোর্ড জ্বালিয়ে দেয়া যাবে । ফলে মিসাইল বিমানকে আর আক্রমন করতে পারবে না। মার্কস জেনারেটর ভারি হলেও এর প্রধান সুবিধা হলো এগলো বার বার ব্যাবহার করা যায়।
আরও এক ভাবে বিজ্ঞানীরা ই-বোমা তৈরি করেত সক্ষম হেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাবহার করা হয়েছে প্রচলিত বিস্ফোরক দ্রব্য। দুই কিলো টিএনটিতে যে শক্তি জমা আছে তা দিয়ে মাইক্রোওয়েভের এক বিশাল স্পন্দন তৈরি করা সম্ভব। এর জন্য বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন ফ্লাক্স কমপ্রেসার নামক একটি যন্ত্র। এ যন্ত্রের মাধ্যমে চৌম্বক ক্ষেত্রকে আরও ছোট ভলিউমে ঠেসে দেয়া যায়। ফ্লাক্স কমপ্রেসারের মধ্য বিস্ফোরক দ্রব্যের বিস্ফোরন ঘটানো হলে মাইক্রোওয়েভের এক বিশাল স্পন্দন তৈরি হয়। ত্র্যান্টেনারের মাধ্যমে এ স্পন্দন ছড়িয়ে দেয়া হয়। ফ্লাক্স কমপ্রেসারের সুবিধা হলো মার্কস জেনারেটর তুলনায় এটি তৈরি করা অনেক সহজ। কিন্তু এটি এক বার মাত্র ব্যাবহার করা যায়। কারন প্রচন্ড বিস্ফোন ফলে যন্ত্রটি নিজেও ধ্বংস হয়ে যায়। টিপিএল নামক একটি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানী যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর জন্য মাইক্রোওয়েভ যন্ত্র বানাতে কাজ করছে। তারা চাচ্ছে প্রচলিত বোমার মত এ সব ই-বোমা বিমানে করে নির্দষ্ট কোন স্থানে ফেলতে। যুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার গুলোতে ই-বোমা ফেল্লে কোন রকম প্রনহানী ছাড়াই প্রতিপক্ষেকে ঘায়েল কারা সম্ভব হবে। কিন্তু ই-বোমা যে একেবারেই নিরাপদ তা কিন্তু নয়। কারন যদি উড়ন্ত কোন বিমান কে লক্ষ্য করে ই-বোমা ছোড়া হয় তাহলে ঐ বিমান এবং যাত্রীদের কি অবস্থা হবে তা সহজেই বোঝা যায়। তবে ই-বোমার সুবিধার দিক গুলোই বেশি। যেমন রক্তপাত বা ধ্বংস সাধন না করেই যুদ্ধে সাফল্য লাভ করা যাবে। আবার ই-বোমার আরেক টি বড় গুন হলো এর গোপনীয়তা অর্থাত্ শত্রু পক্ষ জনার আগেই কাজ সেরে সটকে পড়া সম্ভব। ই-বোমা যে ছোঁড়া হয়েছে তা সহজেই আস্বীকার সম্ভব। কারন এর কোন প্রমান থাকে না।

ই-বোমা এবং সন্ত্রাসবাদ
ই-বোমা ব্যবহার করে যুদ্ধে আনেকটাই সফল হওয়া যাবে। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো যদি আপরাধীদের কাছে এ বোমা পৌঁছে যায় তাহলে কি হবে? ই-বোমার একটি সুবিধা হলো এটি খুব সহজেই তৈরি করা যায়। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স দোকানে কমপ্যাক্ট মাইক্রোওয়েভ সোর্স বিক্রি হয় যা ইলেকট্রনিক্স বিভিন্ন পার্সের সহ্য ক্ষমতা পরিক্ষা করতে ব্যবহার হরা হয়। এ ছোট এই মাইক্রোওয়েভ সোর্স অনেক গুলো এক সাথে করে সহজেই ছোট-খাটো একটি ই-বোমা তৈরি করা যায়।
বেলজিয়ামের আন্তর্জাতিক বেতার বিজ্ঞান ইউনিয়নের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক নয়েজ এবং ইন্টারফেয়ারেন্স কমিশনের প্রধান বব গার্ডনার বলেন, আপরাধীরা ই-বোমা ইতো মধ্যই ব্যাবহার করে থাকতে পারে। রাশিয়ার পাওয়া কিছু রির্পোটে জানা গেছে,ব্যাংকের নীরাপত্তা ব্যবস্থাকে নষ্ট করে দিতে এবং পুলিশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করতে ই-বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। লন্ডনেও এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনার খবর পাওয়াগেছে। যেহেতু ই-বোমা ব্যবহারের কোন প্রমান থাকে না তাই এ ঘটনা গুলো অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

কম্পিউটার প্রযুক্তি এবং ই-বোমা
বর্তমান সময়ের কম্পিউটার গুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের দিনের কম্পিউটারের তুলনায় আনেকটাই দূবর্ল। কারন এখনকার কম্পিউটার গুলো চলে মাত্র দুই ভোল্টে কারন দ্রুত সিগন্যাল পঠাতে হলে কম ভোল্টেজই দরকার। তাতে প্রসেসর খুব বেশি গরম হয়না। অথচ ৮০’র দশকের কম্পিউটার গুলো চলত ৫ ভোল্টে। যার ফলে প্রসেসর বা অন্যান্য পার্সর সহ্য ক্ষমাতা ছিল বেশি। কম্পিউটারের মাদার বোর্ডে বা নেটওয়ার্ক কেবলের মধ্য দিয়ে যে সিগন্যল আসা যাওয়া করে তাতে যদি হঠাত্ ভোল্টেজের পরিমান বেড়ে যায় তাহলে কাম্পিউটার বা পুরো কাম্পিউটার নেটওয়ার্কই বিকল হয়ে যেতে পারে। কাম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যাবস্থা আসলে খুবই সংবেদনশীল কারন নেটওয়ার্কিং জন্য যে কেবল গুলো ব্যাবহার তা সহজেই মাইক্রোওয়েভের গ্রাহক ত্র্যান্টেনা হিসাবে কজ করে। আর নেটওয়ার্কিং জন্য রেডিও লিঙ্ক ব্যাবহার হলে ই-বোমা আরও সহজেই আঘাত হানতে পারে। আগামী দিনে কাম্পিউটার প্রযুক্তির জন্য ই-বোমা হুমকির কারন হয়ে দাঁড়াতে পারে। শুধুকি কম্পিউটার প্রযুক্তির হুমকির মুখমুখী হবে? না , ই-বোমার প্রভাব আরও ব্যপক। ই-বোমা প্রয়োগ করা হলে এর আশেপাশে কোন ইলেকট্রনিক্সই টিকতে পরবে না। এমনকি আপনার সব সময়ের সঙ্গি প্রিয় মোবাইল সেট টি ও মুহূর্তের মধ্যেই চিরতরে নিরব হয়ে যেতে পারে। আপনার হাতে থাকা ডিজিটাল ঘড়ি টি ও ই-বোমা থেকে রেহাই পাবে না।
তবে আশার কথা হচ্ছে বিজ্ঞানীরা ই-বোমার ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে এখন থেকেই ই-বোমার প্রতিরোধ ব্যাবস্থা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। এবং চেষ্টা করছেন কি ভাবে শান্তির কাজে ই-বোমা ব্যাবহার করা যায়।
মানুষ সবসময়ই ধ্বংসের বিপক্ষে এবং সৃষ্টির পক্ষে। ধ্বংসের মধ্য কখনই সৃষ্টির আনন্দ কে খুজে পাওয়া যায় না। তাই ই-বোমা নিয়ে আমাদের এখনই ভাববার সময়।

Asif

Advertisements
By rahmatullahbhuiyan Posted in IT

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s